নিদ্রাহীনতা এখন খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। প্রায় সবাই এই সমস্যায় ভোগেন। রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুম হয় এমন মানুষদের এক-চতুর্থাংশ কার্ডিওভাসকুলার সমস্যায় ভোগেন। ‘স্লিপ’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।ঘুম কম হলে ধমনীতে রক্ত চলাচলে বাধা, দুর্বল বোধ করাসহ নানা সমস্যা হতে পারে-

আলসার : পেটে প্রদাহজনিত কারণে আলসার রোগ হয়ে থাকে। ২০১৪ সালে করা একটি গবেষণা দেখা গেছে, নিদ্রাহীনতা ও অতিরিক্ত নিদ্রা উভয়ের কারণ পেটে প্রদাহজনিত রোগ হতে পারে। ম্যাসাচুসেটের জেনালের হাসপাতালেরে একদল চিকিৎসক তাদের গবেষণায় দেখেন, হজম করার পদ্ধতির মাধ্যমে পেটে প্রদাহ কমাতে ঘুম অপরিহার্য। ঘুমের কারণে এ রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ছয় ঘণ্টার কম ঘুমালে আলসারের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে আবার নয় ঘণ্টার বেশি ঘুমালেও এ রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রোস্টেট ক্যানসার : ২০১৩ সালে ক্যানসার অ্যাপিডিমোলজি, বায়োমেকার ও প্রিভেনশন জার্নালে

3459

প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেকোনো ধরনের নিদ্রাহীনতা রোগীদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যনসার একটি অতি সাধারণ রোগ। ২,৪২৫ জন লোকের ওপর ৩ থেকে ৭ বছর ধরে তাদের ওপর গবেষণা করা হয়। তাদের বয়স ৬৭ থেকে ৯৬ বছর। যেসব মানুষ ঘুমাতে পারেন না তাদের ৬০ শতাংশ লোক প্রোস্টেট ক্যনসার ঝুঁকিতে রয়েছেন। যারা একেবারেই ঘুমাতেই পারেন না তারা এ রোগ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন।

পাকস্থলী : যারা অভ্যাসগতভাবে দিনে ৫ ঘণ্টা ঘুমান তাদের পাকস্থলীতে লেপটিন হরমোনের পরিমাণ ১৫.৫ শতাংশ কমে যায়। এটি আপনাকে ভরপেট অনুভব করতে সহায়তা করে এবং ফ্যাট সঞ্চয়ের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের গবেষণায় এসব তথ্য জানানো হয়।

মস্তিষ্ক : টানা তিন দিন ধরে দিনে ১৯ ঘণ্টা করে জেগে থাকলে মস্তিষ্কের কোষগুলো মরে যাওয়া শুরু করে। পশুদের ওপর করা এই গবেষণায় এমন ফলাফল পাওয়া গেলেও বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও তাই হবে। এ সমস্যায় আলঝেইমার এবং ডেমেনশিয়া হতে পারে এমন প্রোটিনকে পরিষ্কার করতে পারে না মস্তিষ্ক

কোমর : স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, যারা রাতে মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমান তাদের বডি ম্যাস ইনডেক্স গড়ের চেয়ে ৩.৬ শতাংশ বেশি থাকে। তাদের মাঝে স্থূলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে কোমরে চর্বি জমে যায়।

রক্তচাপ : যারা ৬ ঘণ্টার কম ঘুমান তাদের সিসটোলিক বিপি ১৩২-এ উঠে যায়। এর স্বাভাবিক মাপ ১২০ এর কম। ঘুমের অভাবে কর্টিসল হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায় যাকে স্ট্রেস হরমোন বলা হয়।

আলঝেইমার : চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলঝেইমার স্মৃতিভ্রংশ রোগ হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিদ্যালয়ের একদল গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন, ঘুমের ঘাটতির কারণে আলঝেইমার রোগ হয়ে থাকে। নিদ্রাহীনতা এ রোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের বর্জ্য (বিভিন্ন খারাপ স্মৃতি মাথায় জমা হয়) অপসারণের জন্য কয়েক ঘণ্টাব্যাপী ঘুমের প্রয়োজন।

স্থুলতা ও ডায়াবেটিস : ঘুমের অভাবে ডায়াবেটিস হয়। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন, ঘুমের ঘাটতি ডায়াবেটিসের পাশাপাশি স্থুলতা বাড়ায়। রক্তের ফ্যাটি অ্যাসিড বিপাক প্রক্রিয়ায় এবং স্বাভাবিক রক্তের সুগার রক্ষায় ইনসুলিনের ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ঘুম কম হওয়ার কারণে মানুষের দেহে ফ্যাটি অ্যাসিড জমা হয়।

গবেষণা ১৯ জন মানুষের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ চার ঘণ্টা বা এর কম ঘুমায় তাদের রক্তে বেশি ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া গেছে।

হৃদরোগ : নিদ্রাহীনতা হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির এক বার্ষিক সভায় এক দল বিশেষজ্ঞ তাদের একটি গবেষণায় ফলাফলে বিষয়টি সমর্থন করেছে। ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের ৬৫৭ জন রুশ নাগরিকের ১৪ বছরের নিদ্রাভাসের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব লোক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর বেঁচে আছেন তাদের দুই-তৃতীয়াংশ লোক মারাত্মক নিদ্রাহীনতায় ভোগেন।

আত্মহত্যা : ২০১৪ সালে বেশি ও কম ঘুমায় এমন লোকদের মধ্যে আত্মহত্যার চিত্র উদঘাটনের চেষ্টা করেন। সেখানে ঘুমের সঙ্গে আত্মহত্যার হার কম-বেশির সম্পর্ক রয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের গবেষকরা ১০ বছর ধরে একটি গবেষণা করেন। ৪২০ জনের ওপর চালানো ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিদ্রাহীনতার ভোগেন তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি।